২০২৫ সালের ১৭ জুলাই সাভারের নিজ বাড়ি থেকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নিশান মোহাম্মদ দুলালকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগ—তিনি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষার্থী সাজ্জাদ হোসেন হত্যার ঘটনায় জড়িত। ঘটনার ১১ মাস আগে, সাজ্জাদের বাবা মোহাম্মদ আলমগীর সাভার মডেল থানায় ফার্স্ট ইনফরমেশন রিপোর্ট (এফআইআর) করেছিলেন, যেখানে ৩২১ জনের মধ্যে দুলালের নামও ছিল। এজাহারে তাকে “সাভার যুবলীগের সভাপতি” বলা হয়েছিল, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা; দুলাল কোনো রাজনৈতিক কমিটির সদস্য ছিলেন না।
ঘটনার দিন সাজ্জাদ বাজার করতে গিয়েছিলেন, তিনি কোনো বিক্ষোভে অংশ নেননি। সাভার বাসস্ট্যান্ডের কাছে তাকে গুলি করা হয়, পরে এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে তিনি মারা যান। পুলিশ প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে দুলালের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়নি। তবে “সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে” তাঁকে কারাগারে রাখা হয়েছে। দুলাল তিন মাসের বেশি সময় ধরে আটক, এবং জামিন এখন পর্যন্ত মঞ্জুর হয়নি।
নিহতের স্ত্রী সানজিদা জানিয়েছে, মামলার আসামি তালিকা তৈরি করতে স্থানীয় বিএনপি নেতা গোলাম মোস্তফা ও তাঁর ভাই যুবদল নেতা শহিদুল ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তারা প্রতিদিন দুলালের পরিবারের বাড়িতে আসতেন, বিভিন্ন নাম নোটবুকে লিখে তালিকায় যুক্ত করতেন। সাজ্জাদের বাবা স্বীকার করেছেন, তিনি অনেককে চেনতেন না; পুলিশ ও স্থানীয় নেতাদের পরামর্শেই এজাহারে দুলালের নাম যুক্ত হয়। মোস্তফা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
দুলালের পরিবার মনে করছে, এটি শুধুই ব্যবসায়িক স্বার্থের জন্য করা হয়েছিল। তাদের পারিবারিক ব্যবসা—উইন্টার ড্রেস লিমিটেডের সঙ্গে গার্মেন্টস কারখানার টিফিন সরবরাহ—দখলের উদ্দেশ্য ছিল। ২০১১ সালে তারা দেড় একর জমি বিক্রি করে কারখানা স্থাপন করে। ২০১৬ সালে যুবলীগ নেতা সোহেল রানা সাভারে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হন এবং দুলালের আয়ের একটি বড় অংশ দাবি করেন। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর দুলালের ভাই জসিমকে জোরপূর্বক ব্যবসা হস্তান্তর করতে বলা হয়।
২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সোহেল রানা ও তাঁর ভাই দেশ ছাড়েন। কিন্তু এবার স্থানীয় বিএনপি নেতারা ব্যবসা দখলে নেমে আসেন। তারা দুলালের পরিবারকে মাসিক কিছু টাকা “ক্ষতিপূরণ” হিসেবে দিচ্ছেন, যদিও ব্যবসার বড় অংশ নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন।
এই ঘটনা স্পষ্ট করে দেখায়, বাংলাদেশের পুলিশ ও বিচারব্যবস্থা কতটা রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক স্বার্থের প্রভাবের মধ্যে আটকে আছে। প্রমাণহীন অভিযোগের ভিত্তিতে একজন মানুষ কারাগারে থাকে, আর ব্যবসা ও রাজনৈতিক শক্তির লোকেরা নিরাপদ। ক্ষমতা পরিবর্তন হলেও বিচারব্যবস্থার অবস্থা অপরিবর্তিত থেকে যায়। দুলালের ঘটনা আজকের বাংলাদেশে ন্যায়বিচারের চরম অভাব এবং রাজনৈতিক ও আর্থিক প্রভাবের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।
সূত্র: প্রথম আলো