বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধাক্কার সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিরতা যুক্ত হলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। ইনফোডের নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তফা কে. মুজেরী জানান, বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিতিশীলতা বিনিয়োগ পরিবেশকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করেছে। বিনিয়োগকারীরা এখন অত্যন্ত সতর্ক এবং নতুন প্রকল্পে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি দীর্ঘদিন ধরে সর্বনিম্নে, বিদেশি বিনিয়োগ কার্যত স্থবির, আর মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিও নিম্নমুখী। তাঁর মতে, কার্যকর রাজনৈতিক স্থিতি না এলে বেসরকারি খাতের স্থবিরতা কাটবে না।
ব্যাংক খাতের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমেছে ৬ শতাংশে, যা চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। জুন প্রান্তিকে বিদেশি নিট ইকুইটি বিনিয়োগও কমেছে ৬০ শতাংশের বেশি। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ সংকোচনের মূল কারণ।
শ্রমিক আন্দোলন, জ্বালানি সংকট এবং ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদের কারণে বিভিন্ন শিল্প এলাকায় এক লাখের বেশি শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন। বিজিএমইএ জানায়, গত ১৪ মাসে ৩৫৩টি কারখানা বন্ধ হয়েছে, যার মধ্যে সাভারের ২১৪টি। এতে কর্মসংস্থান এবং উৎপাদনে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। বিজিএমইএ সভাপতি সতর্ক করেন, এলডিসি উত্তরণের আগে যদি স্থায়ী সমাধান না হয়, বিনিয়োগ ও রপ্তানি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরে এলসি খোলা ১২ শতাংশ কমেছে। আগের এলসির বিপরীতে বিল পরিশোধও ১১ শতাংশ কমেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ডলারের সরবরাহ পর্যাপ্ত হলেও বিনিয়োগ ও চাহিদার পতন আমদানির মন্থরতার মূল কারণ। আমদানিতে ওভার ইনভয়েসিং ও অর্থপাচার নিয়ন্ত্রণে আসায় এলসি খোলার চাপও কমেছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) মনে করছে, চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪.৯ শতাংশে থাকবে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ৫ শতাংশ, সরকার ৫.৫ শতাংশ এবং বিশ্বব্যাংক ৪.৮ শতাংশ অনুমান করছে। তবে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে রাজস্ব আহরণ, ব্যাংক খাত সংস্কার এবং স্বচ্ছ বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
রপ্তানি ক্ষেত্রেও নেতিবাচক ধারা দেখা যাচ্ছে। ইপিবি তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরের রপ্তানি আদেশ সেপ্টেম্বরের তুলনায় প্রায় ৪০ কোটি ডলার কমেছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের কারখানায় অর্ডার কমেছে ১৫–২৬ শতাংশ। জুলাই–অক্টোবর মাসে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ৮.৫ শতাংশ, যা লক্ষ্য থেকে কম। তৈরি পোশাক শিল্প, যা রপ্তানির ৮৫ শতাংশ, তার প্রবৃদ্ধিও মন্থর।
পুঁজিবাজারেও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়েছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সূচক এক মাসে ৪২০ পয়েন্ট কমেছে, চট্টগ্রামের সূচকও উল্লেখযোগ্যভাবে নেমেছে। আইএমএফ সতর্ক করেছেন, রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং আর্থিক খাতের দুর্বলতা কাটানো ছাড়া সামষ্টিক স্থিতিশীলতা বিপন্ন হতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক স্থিতি ছাড়া অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত হলে এলসি, আমদানি এবং বিনিয়োগ—সব খাতেই গতি ফিরে আসবে। ব্যবসায়ীরা ব্যাংকঋণের সুদ এক অঙ্কে নামানোর দাবি জানিয়েছেন। এফবিসিসিআই ও অন্যান্য ব্যবসায়ী সংগঠন মনে করেন, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ ও সুষ্ঠু নীতি ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়।