আজ সোমবার বিকেল ৪টায় নারায়ণগঞ্জের হাজীগঞ্জ এলাকায় ‘জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ’ উদ্বোধন শেষে এসব কথা বলেন তিনি। শহীদ পরিবারগুলোর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন,
“আপনাদের মনে সব সময় একটা আর্তি থাকে, একটা ক্রন্দন থাকে—এত বড় গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ হলো, এমনভাবে আমাদের লোকদেরকে হত্যা করা হলো, আমাদের ভাইদের চোখ কেড়ে নেওয়া হলো, অঙ্গহানি করা হলো...জঘন্য, বীভৎস, নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার কোথায়? আমি আপনাদেরকে দৃঢ় কণ্ঠে জানাতে চাই, এই হত্যাকাণ্ডের বিচার হবেই।”
তিনি আরও বলেন, “জুলাই মাস এলেই আমাদের মনে পড়ে গত বছরের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। এই মাসেই সূচিত আন্দোলনের মাধ্যমে জনগণ ১৫ দিনের মধ্যেই দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থাকে বাংলাদেশের মাটি থেকে উৎখাত করেছিল।”
আইজিপি-সংক্রান্ত মামলাসহ বিভিন্ন অপরাধের বিষয়ে তিনি জানান, “আমি নারায়ণগঞ্জের মামলাগুলোর খোঁজ নিয়েছি। এসপি সাহেব জানিয়েছেন, অনেক মামলার তদন্তে অগ্রগতি হয়েছে। আমি অনুরোধ করেছি, ৫ আগস্টের আগেই যেন চার্জশিট প্রদান করা যায়। তিনি আমাকে আশ্বস্ত করেছেন, অনেকগুলোর চার্জশিট দেওয়া সম্ভব হবে। এরপর বিচার প্রক্রিয়া শুরু হবে। প্রয়োজনে দ্রুত বিচার আইনের মাধ্যমে এসব অপরাধের বিচার করা হবে।”
তিনি বলেন, “আমাদের আত্মত্যাগ, বেদনা, ক্ষোভ, সাহস—সবকিছু মিলিয়ে আমরা একটি পরিবারে পরিণত হয়েছিলাম। বাংলাদেশের মানুষ একটি বৈষম্যহীন, শোষণহীন নতুন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্নে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। এই রাষ্ট্রে কোনো শাসক যেন অপশাসক না হয়, আমরা চাই সেখানে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হোক।”
স্থানীয় পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলার অবনতির বিষয়ে তিনি বলেন, “চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। প্রশাসন সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।”
অনুষ্ঠানে শিল্প ও গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান বলেন, “বিভিন্ন জেলায় ‘জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ’ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গণভবনকে একটি ফ্যাসিবাদবিরোধী জাদুঘরে রূপান্তরের কাজ চলছে, যার উদ্বোধন ৫ আগস্টের আগেই হবে। আমরা চাই, জনগণ বুঝুক—কীভাবে ফ্যাসিবাদ মানবতাকে পদদলিত করে।”
তিনি আরও বলেন, “শহীদদের কবর সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে সংগ্রামের ধারা শেষ করা যাবে না, তা আপনাদের হাতে সঁপে দিতে চাই। আপনারা আগুন হাতে রাজপথে নেমেছিলেন, সেই অগ্নিযুগের উত্তরসূরি আপনারাই এই আন্দোলনকে সামনে এগিয়ে নেবেন।”
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, “আমাদের ছাত্র-জনতা দেশকে স্বৈরাচার ও বৈষম্যমুক্ত করেছে। এই জুলাই মাস আমাদের সেই ত্যাগের কথা মনে করিয়ে দেয়। নারায়ণগঞ্জে ৫৬ জন শহীদ হয়েছিলেন, যাঁদের মধ্যে ২১ জন এখানকার সন্তান।”
তিনি বলেন, “শহীদরা বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে জীবন দিয়েছিলেন। তাদের প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো সম্ভব, যখন দোষীদের বিচারের মুখোমুখি করা যায়। যারা সাধারণ জনগণের চোখ কেড়েছে, পঙ্গু করেছে—তাদের বিচারও আমরা করব।”
তিনি আরও বলেন, “এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। তা বাস্তবায়নে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে। জুলাইয়ে ছাত্র-জনতা যদি বুক চিতিয়ে বুলেটের সামনে না দাঁড়াতেন, তাহলে ৫ আগস্টের ইতিহাস রচিত হতো না।”
অনুষ্ঠানে শহীদ পরিবারের সদস্য, জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা, পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদারসহ জেলার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।