বাংলাদেশে গত বছরের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও সরকারের পতনের পর থেকেই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ভারত সরকার বাংলাদেশিদের জন্য ভ্রমণ ভিসা ইস্যু বন্ধ করে দেয়, যা এখনও চালু হয়নি। এর ফলে কলকাতার 'মিনি বাংলাদেশ' খ্যাত নিউমার্কেট সংলগ্ন ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, মারকুইস স্ট্রিটসহ আশপাশের এলাকার অর্থনীতি বড় ধাক্কা খেয়েছে।
এক সময় বাংলাদেশি পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত এই এলাকাগুলো এখন পর্যটকশূন্য। হোটেল, রেস্তোরাঁ, খুচরা ব্যবসা, মুদ্রা বিনিময়, চিকিৎসা পর্যটনসহ সংশ্লিষ্ট খাতে অন্তত ৫ হাজার কোটি রুপির ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন ব্যবসায়ীরা। শুধু ‘মিনি বাংলাদেশ’ অঞ্চলেই ক্ষতির পরিমাণ ১ হাজার কোটি রুপি ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়া।
ফ্রি স্কুল স্ট্রিট ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক হায়দার আলী খান বলেন, “প্রতিদিন গড়ে ৩ কোটি রুপির ব্যবসা হতো এই এলাকায়। এখন সেটি প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে। নিউমার্কেট এবং বড়বাজারের ব্যবসা যোগ করলে ক্ষতির পরিমাণ ৫ হাজার কোটি ছাড়াবে।”
মুদ্রা বিনিময় ব্যবসার অবস্থা আরও করুণ। কারেন্সি এক্সচেঞ্জার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক মোহাম্মদ ইন্তেজার বলেন, “আমরা কেবল বাংলাদেশি পর্যটকদের ওপর নির্ভর করতাম। তাদের না থাকায় এখন টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে।”
মারকুইস স্ট্রিটের এক ট্র্যাভেল কোম্পানির ম্যানেজার প্রবীর বিশ্বাস বলেন, “এক বছর আগেও এই সময়ে ভিড়ের কারণে পার্কিং করাই দুঃসাধ্য ছিল। এখন অনেক দিন চলে যায়, একজন পর্যটকও আসে না।”
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, গত এক বছরে প্রায় ৪০ শতাংশ ছোট ও মাঝারি রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে গেছে। যারা এখনো চালু রয়েছে, তারাও সীমিত আকারে ব্যয় সংকোচন করে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। রাঁধুনি রেস্তোরাঁর মালিক এন. সি. ভৌমিক বলেন, “ব্যবসা ২০ শতাংশে নেমে এসেছে। অলাভজনক হয়ে পড়েছে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান।”
কোভিড মহামারির সময় ব্যবসায়ীরা যখন পুনরুদ্ধারের আশায় নতুন বিনিয়োগ করেছিলেন, তখন এই রাজনৈতিক সংকট দ্বিতীয়বারের মতো বড় আঘাত এনেছে। একজন রেস্তোরাঁ মালিকের ছোট ভাই বলেন, “ঋণ নিয়ে ব্যবসা সংস্কার করেছিলাম। এখন আয় নেই, কিন্তু ইএমআই দিতে হচ্ছে।”
শুধু বড় ব্যবসা নয়, পর্যটন নির্ভর অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি যেমন হোমস্টে, ট্যুর গাইড, স্থানীয় গাড়ি ভাড়া, ঘরোয়া খাবার সরবরাহসহ ছোট ছোট পেশাগুলোও ধসে পড়েছে। এর ফলে শত শত কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়েছে। এলিয়ট রোডের বাসিন্দা ফারহান রসুল বলেন, “মহামারির পর নতুন গাড়ি কিনে ব্যবসা শুরু করেছিলাম। এখন মাসে পাঁচ-ছয়টি বুকিং পাই, তাও স্থানীয়দের কাছ থেকে।”
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, এই অচলাবস্থা কাটাতে দুই দেশের মধ্যে দ্রুত কূটনৈতিক সমঝোতা প্রয়োজন, নইলে ‘মিনি বাংলাদেশ’ নামের ঐতিহ্যবাহী এই অঞ্চল চিরতরে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।