কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এই শক্তিশালী মাধ্যমটি অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন দিকে মোড় নিয়েছে। তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন তৈরির বদলে, এটি কখনো কখনো ব্যক্তিকে—বিশেষত নারীদের—অপ্রস্তুত মুহূর্তে ধারণ করে তা ছড়িয়ে দেওয়ার হাতিয়ার হয়ে উঠছে। জনসমাগমে থাকা কোনো নারীর স্বাভাবিক আচরণ বা সামান্য মুহূর্তকেও ‘খবর’ বানিয়ে ভিডিও, ছবি ও চটকদার ক্যাপশনের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা মূলত অপমানজনক কনটেন্ট ছাড়া কিছুই নয়।
এখানে প্রযুক্তি নয়, ব্যবহারের উদ্দেশ্যটাই প্রশ্নবিদ্ধ। ক্যামেরা জনজীবন ধারণের জন্য ব্যবহৃত হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু যখন সেটি তথ্য উপস্থাপনের বদলে কাউকে বিব্রত বা ছোট করার উপকরণে পরিণত হয়, তখন সেটি আর সাংবাদিকতা থাকে না। বরং ব্যক্তি হয়ে ওঠেন একটি ‘কনটেন্ট’, যেখানে প্রেক্ষাপটের বদলে গুরুত্ব পায় দৃষ্টি আকর্ষণ আর কৌতূহল তৈরি করা।
এই প্রবণতাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে কিছু অনিয়ন্ত্রিত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম—ফেসবুক পেজ, টিকটক অ্যাকাউন্ট, ইউটিউব চ্যানেল ও ভুঁইফোড় তথাকথিত নিউজ পোর্টাল। তারা অপমানকেই পণ্য বানিয়ে প্রচার করছে। উদ্বেগজনক হলো, মাঝে মাঝে কিছু প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমও একই পথে হাঁটছে, যেখানে জনস্বার্থের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে দর্শক টানার কৌশল। এতে শুধু ব্যক্তির মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে না, সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসসহ বিভিন্ন স্থানে এমন কিছু ঘটনা সামনে এসেছে, যেখানে ব্যক্তিকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে জুম করে ভিডিও ধারণ করা বা অনুমতি ছাড়া ফুটেজ সংগ্রহ করার অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনা দেখিয়ে দেয়, সমস্যাটি বিচ্ছিন্ন নয়; বরং পেশাগত নীতির ভেতরেই এক ধরনের অবক্ষয় ঢুকে পড়েছে।
এটি কেবল ব্যক্তিগত অপমানের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আইনি ও নৈতিক দায়ও। আইন অনুযায়ী কারও শ্লীলতাহানি বা গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ খুব সীমিত। বিশেষ করে যখন ভুক্তভোগী নারী বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কেউ হন, তখন প্রয়োজনীয় তৎপরতা অনেক সময় চোখে পড়ে না।
নিবন্ধিত গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে দায় আরও বেশি। রাষ্ট্রের দেওয়া বৈধতা ব্যবহার করে কেউ যদি অপমানজনক কনটেন্ট ছড়ায়, তবে তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একইভাবে অনিবন্ধিত পেজ বা ভুয়া পোর্টালগুলোর ক্ষেত্রেও দ্রুত কনটেন্ট অপসারণ, অভিযোগ গ্রহণ ও পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
সবশেষে, বিষয়টি শুধু নীতির নয়—সাংবাদিকতার অস্তিত্বের প্রশ্ন। যখন অপমানকে ‘সংবাদ’ হিসেবে পরিবেশন করা হয়, তখন মানুষের আস্থা কমে যায়। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা মানে কাউকে শিকার বানানো নয়; বরং নাগরিকের মর্যাদা রক্ষা করা। যদি এই সীমারেখা অতিক্রম করা হয়, তবে সাংবাদিকতাই একসময় সেই সমস্যার অংশ হয়ে উঠবে, যাকে উন্মোচন করার দায়িত্ব তারই ছিল।
লেখক: সাংবাদিক আরাফাত রহমান