গত মঙ্গলবার (১৯ আগস্ট) বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথিভবন যমুনায় নিহত শিক্ষকদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন প্রধান উপদেষ্টা। এসময় নিহত শিক্ষকদের স্বজন, ঘনিষ্ঠজন এবং সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “বেশ কিছুদিন পার হলেও এই স্মৃতি সবার ভেতরে এখনো গভীরভাবে দগদগে হয়ে আছে। আমি শুরুতেই আপনাদের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তখন আপনাদের দুঃসময়কে সম্মান জানিয়েছি। আজ আপনাদের কাছে এসেছি শুধু সমবেদনা জানাতে নয়, বরং এই শোককে ভাগাভাগি করতে। কারণ এ শোক কেবল আপনাদের নয়, পুরো জাতির।”
তিনি নিহত শিক্ষকদের পরিবারের কাছে তাদের প্রিয়জনদের শেষ মুহূর্তের স্মৃতি জানতে চান এবং মনোযোগ দিয়ে তা শোনেন।
শিক্ষক মাহেরীন চৌধুরীর স্বামী মনসুর হেলাল জানান, দুর্ঘটনার পর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে স্ত্রীর সঙ্গে শেষবারের মতো কথা হয়েছিল। তখনও তিনি শিশুদের কথা ভেবেছেন, নিজের সন্তানদের নয়। হেলালের ভাষায়, “আমি তাকে বলেছিলাম—তুমি কেন বের হয়ে এলে না? তোমার নিজের দুই সন্তানের কথা কি মনে হয়নি? সে উত্তর দিয়েছিল—ওরাও তো আমার সন্তান। আমি তাদের একা ফেলে কীভাবে চলে আসি!”
জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ২৪ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর ১৪ আগস্ট মারা যান শিক্ষক মাহফুজা খাতুন। তাঁর মেয়ে আয়েশা সিদ্দিকা অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলেন, “মা অনেকখানি সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন। আমি ভেবেছিলাম মাকে নিয়ে বাড়ি ফিরব। কিন্তু এখন আমি মা’হীন। আমার বাবা আগেই মারা গেছেন, এখন মা-ও চলে গেলেন। আমি এতিম হয়ে গেলাম।”
শিক্ষক মাসুকা বেগমের ভগ্নিপতি খলিলুর রহমান বলেন, তাঁর বোন দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন এবং মাসুকা সবসময় বাবার চিকিৎসা ও পরিবারের খোঁজখবর নিতেন। “সে শুধু আমাদের পরিবার নয়, আমার সন্তানদেরও নিজের সন্তানের মতো দেখত। প্রতিদিন আমাদের সঙ্গে কথা বলত। স্কুল আর পরিবার—এই ছিল তার জীবনের সবকিছু।”
নিহত শিক্ষকদের আত্মত্যাগের প্রসঙ্গ টেনে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “তাদের কথা শুনতে কষ্ট হয়, কিন্তু একইসঙ্গে গর্ববোধও হয়। তারা আগুনের ভেতরে ঝাঁপ দিয়ে শিশুদের বাঁচিয়েছেন। নিজেদের জীবনকে তুচ্ছ করে মানবতার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা আমাদের ছোট করেছে আবার বড়ও করেছে। সবার মনে এই প্রশ্ন জাগিয়েছে—আমি যদি সেই অবস্থানে থাকতাম, আমি কি পারতাম নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে অন্যের জীবন বাঁচাতে?”
তিনি আরও বলেন, “এই শিক্ষকগণ আমাদের গর্ব, আমাদের আদর্শ। তাদের স্মৃতি ধরে রাখতে এবং প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে যা কিছু করা প্রয়োজন, আমরা তা করব।”
এসময় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে ছিলেন পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার, মহিলা ও শিশু বিষয়ক উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদ, সড়ক পরিবহন ও বিদ্যুৎ-জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরার, গৃহায়ন ও গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান এবং এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদ।