আইপিও তহবিলের অব্যবহৃত অর্থ
ঢাকা পোস্টের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত ১০ বছরে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করা অন্তত দুই ডজন কোম্পানি তাদের আইপিও তহবিল ব্যবহারে হিমশিম খাচ্ছে। অনেক কোম্পানি দীর্ঘ সময় পার করেও তহবিল ব্যবহার করে শেষ করতে পারেনি। কোনো কোনো কোম্পানি বারবার সময় বাড়িয়েও বিনিয়োগ করতে ব্যর্থ হয়েছে। গত অর্থবছরে (২০২৪-২৫) বেশ কয়েকটি কোম্পানি তাদের আইপিও তহবিলের এক টাকাও ব্যবহার করেনি, আবার কিছু কোম্পানি সামান্য পরিমাণে ব্যবহার করলেও তা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম।
অর্থনীতিবিদ ও পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, "অনেক কোম্পানিই কোনো ধরনের উদ্দেশ্য ছাড়া আইপিওতে এসেছে। তারা একটা মনগড়া ব্যয় পরিকল্পনা তৈরি করে বিএসইসিতে জমা দিয়েছে। তারা কোথায় অর্থ ব্যয় করবে, অথবা ব্যয় করে ভালো মুনাফা পাওয়া যাবে কি না তা বিশ্লেষণ না করেই টাকা নিয়েছে।" তিনি আরও বলেন, কিছু কোম্পানি আইপিওর অর্থ নিজেদের মনে করে লুটপাট করছে এবং নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোম্পানিতে ব্যবহার করছে।
কোম্পানিগুলোর তহবিল ব্যবহারের চিত্র
২০২৪-২৫ অর্থবছরে আইপিও তহবিল থেকে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করেছে বেস্ট হোল্ডিংস পিএলসি। তারা ৩৫০ কোটি টাকার তহবিল থেকে ৭৭ কোটি টাকা বা ২২ শতাংশ ব্যয় করেছে। এর পরেই রয়েছে টেকনো ড্রাগস লিমিটেড, যারা ১০০ কোটি টাকার তহবিলের ৬৪ শতাংশ বা ৬৪ কোটি টাকা ব্যবহার করেছে।
তবে, কিছু বড় কোম্পানি তাদের তহবিল ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য ধীরগতি দেখিয়েছে। যেমন:
গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক: ৪২৫ কোটি টাকার তহবিল থেকে মাত্র ৬ কোটি টাকা (১.৪২%) ব্যবহার করেছে। ব্যাংকটির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এর কারণ হিসেবে উপযুক্ত প্ল্যাটফর্মের অভাব, পুঁজিবাজারের অস্থিরতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ-সংঘাতকে দায়ী করেছেন।
সিকদার ইন্স্যুরেন্স: ১৬ কোটি টাকার তহবিল থেকে মাত্র ২ কোটি টাকা (১২.৫০%) ব্যবহার করেছে।
নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস: ৭৫ কোটি টাকার তহবিল থেকে মাত্র ৮ কোটি টাকা (১৩.৩৩%) ব্যবহার করেছে।
এছাড়াও, সিলভা ফার্মাসিউটিক্যালস, একমি পেস্টিসাইড এবং আমান কটন ফাইব্রাস লিমিটেড গত অর্থবছরে তাদের আইপিও তহবিলের এক টাকাও ব্যবহার করেনি।
বিশ্লেষক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার মতামত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং পুঁজিবাজার টাস্কফোর্সের সদস্য আল-আমিন মনে করেন, ব্যবসায়ীরা মনস্তাত্ত্বিকভাবে বিনিয়োগের জন্য এগিয়ে আসছেন না। অনেক ব্যবসায়ী নির্বাচিত নতুন সরকারের জন্য অপেক্ষা করছেন, কারণ তারা সরকারের ভিশন-মিশন দেখে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে চান। তবে তিনি এটাও বলেন, যেসব কোম্পানি দুর্বল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে অর্থ উত্তোলন করেছে, তারাই এখন বিনিয়োগের সুযোগ পাচ্ছে না।
অধ্যাপক আবু আহমেদ উল্লেখ করেন, কিছু কোম্পানি প্রিমিয়ামে শেয়ার ইস্যু করে বাজার থেকে অধিক পরিমাণ অর্থ তুলে নেয় এবং তাদের পেছনে অসৎ উদ্দেশ্য থাকে। তারা ট্যাক্স ফাঁকি দেয় এবং নামমাত্র লভ্যাংশ দিয়ে বিনিয়োগকারীদের সান্ত্বনা দেয়।
বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম জানান, এখন আর কোনো দুর্বল বা খারাপ কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আসতে দেওয়া হবে না। পাবলিক ইস্যু রুলস ও অন্যান্য বিধানগুলো কঠোরভাবে পরিপালন করে আইপিওতে আসতে হবে। তিনি বলেন, সংস্কারের কাজ শেষ হলে বাজারে ভালো কোম্পানিগুলো আসতে শুরু করবে।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলামও আইপিও প্রক্রিয়া সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছেন, যাতে ভালো কোম্পানি বাজারে আসে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা যায়।
সামগ্রিকভাবে, পুঁজিবাজারে নতুন আইপিও না আসা এবং পুরোনো কোম্পানিগুলোর তহবিল ব্যবহারে ধীরগতি দেশের বিনিয়োগ পরিবেশের বর্তমান চিত্র তুলে ধরছে। এই পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও স্টেকহোল্ডাররা বলছেন, সংস্কারের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ও স্বচ্ছ পুঁজিবাজার তৈরি করাই এখন প্রধান লক্ষ্য।
সূত্র:ঢাকা পোস্ট