নতুন সংবিধান প্রণয়ন ও ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ গঠন, ফ্যাসিবাদী ও পরিবতন্ত্র শাসনব্যবস্থা বিলুপ্তি, এবং ৭১-এর পর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাক্রম হিসেবে উল্লেখ করা ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’-এর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও পরাজিত স্বৈরশক্তির বিচারের দাবি এনসিপির ঘোষণার অন্যতম প্রধান দিক। দলটি বলেছে, এই ইশতেহার শুধুমাত্র একটি দলীয় অঙ্গীকার নয়; এটি জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের নতুন সামাজিক চুক্তির রূপরেখা।
ইশতেহারে তারা ঘোষণা দেয়— প্রশাসনকে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক ও সেবামুখী করতে হবে। দুর্নীতি দমন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংস্কার ও প্রশাসনিক কাঠামোয় ব্যাপক পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে দলটি। আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় একটি স্বাধীন ও কার্যকর বিচারব্যবস্থা গড়ার প্রতিশ্রুতি উচ্চারণ করেছেন নাহিদ ইসলাম।
এনসিপির ২৪ দফার মধ্যে রয়েছে— গ্রাম পার্লামেন্ট প্রতিষ্ঠা ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও শক্তিশালী নাগরিক সমাজের বিকাশ, সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা ও যুগোপযোগী শিক্ষানীতি প্রণয়ন, গবেষণা ও উদ্ভাবন-ভিত্তিক তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লব। এছাড়া ধর্ম, সম্প্রদায় ও জাতিগত মর্যাদা রক্ষায় রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা, নারীর অধিকার, নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিতকরণ এবং ইনসাফভিত্তিক অর্থনীতি গঠনের অঙ্গীকারও রয়েছে দলটির ঘোষণায়।
তরুণদের কর্মসংস্থান, বাণিজ্য ও শিল্পায়নে বহুমুখী নীতি, কৃষক-শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা, টেকসই কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং জাতীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে এই ইশতেহারে। নগরায়ন, পরিবহন ও আবাসনখাতে সুপরিকল্পিত উন্নয়ন, নদী ও সমুদ্র রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ, জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি, প্রবাসী বাংলাদেশিদের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা এবং দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশল পুনর্গঠনের কথা বলেছে এনসিপি।
সমাবেশ উপলক্ষে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে হাজারো নেতাকর্মী, সমর্থক, বিশ্লেষক এবং প্রথমবারের মতো ভোটার হতে যাওয়া বিপুলসংখ্যক তরুণ শহীদ মিনারে সমবেত হন। আয়োজকরা জানান, ‘জুলাই আন্দোলন’-এ নিহতদের স্মরণ ও ন্যায়বিচারের দাবি এদিনের সমাবেশের কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল।
এনসিপি নেতারা বলেন, বিচার, মর্যাদা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে সামনে রেখে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতীয় উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা সময়ের দাবি। তাদের ভাষায়, ‘নতুন বাংলাদেশের ইশতেহার’ শুধু রাজনৈতিক দলীয় ঘোষণাপত্র নয়— এটি জনগণকেন্দ্রিক অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক শাসনের রোডম্যাপ, যা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামো গড়ার প্রাথমিক খসড়া।
সমাবেশে এনসিপির পক্ষ থেকে ‘নতুন বাংলাদেশ ঘোষণা’ শিরোনামে ৪৮ পৃষ্ঠার একটি নীতিপত্র উন্মোচন করা হয়, যা ডিজিটাল ও মুদ্রিত উভয় মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে। এতে ছয়টি মূল স্তম্ভের ভিত্তিতে দলটির নীতিগত অঙ্গীকার ও কর্মপরিকল্পনা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠান শেষে প্রতীকী মঞ্চে লেখা— ‘বিচার। সংস্কার। ভবিষ্যৎ।’— বাক্যটিই গোটা সমাবেশের বার্তা হিসেবে অনুরণিত হয়।