বৃহস্পতিবার রাতে গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত উচ্চ পর্যায়ের নেতাদের বৈঠকে এই অবস্থান নেয় বিএনপি। বৈঠকে ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সভায় অংশ নেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সালাহউদ্দিন আহমেদ, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়সহ দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা।
বৈঠকে বলা হয়, উচ্চকক্ষ গঠন নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনা চলমান থাকলেও, পিআর ভিত্তিক আসন বণ্টন দেশের রাজনৈতিক ভারসাম্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এক্ষেত্রে বিএনপি উচ্চকক্ষ বাতিলের প্রস্তাবেও রাজি, তবে পিআর পদ্ধতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
নেতারা বলেন, বিএনপি এখনও ৩১ দফার আলোকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের প্রতিশ্রুতি বহাল রাখছে। ভবিষ্যতে ক্ষমতায় গেলে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার গুণী ব্যক্তি ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের নিয়ে উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে।
ঐকমত্য কমিশন সর্বশেষ সংলাপে ৬৪ জেলা ও ১২ সিটি করপোরেশন থেকে একজন করে সদস্য মনোনয়নের বিকল্প প্রস্তাব দিলেও বিএনপিসহ অধিকাংশ দল তা প্রত্যাখ্যান করে।বিএনপি এর পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়, উচ্চকক্ষে প্রতিনিধিত্ব নির্ধারিত হবে সংসদের নিম্নকক্ষের দলভিত্তিক আসন সংখ্যার ভিত্তিতে, যা পূর্বের সংরক্ষিত মহিলা আসনের অনুরূপ।অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ ২১টি দল পিআর পদ্ধতির পক্ষে মত দেয়। অনেক দল পিআর ছাড়া উচ্চকক্ষের প্রয়োজনীয়তা নেই বলেও স্পষ্ট মত দিয়েছেন।
নারী আসনের সংখ্যা ৫০ থেকে ১০০-তে উন্নীত করার বিষয়ে বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল একমত হলেও, এই আসনগুলো কীভাবে নির্বাচিত হবে— তা নিয়ে এখনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি দলগুলো।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রাথমিক প্রস্তাব ছিল, সংসদের মোট আসন বাড়িয়ে ৪০০ করা হবে এবং ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে ১০০টি আসনে কেবল নারী প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ থাকবে। কিন্তু এ প্রস্তাবে একমত না হওয়ায়, পরে কমিশন বিকল্প প্রস্তাব দেয়— ২৫টির বেশি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী রাজনৈতিক দলগুলোকে অন্তত এক-তৃতীয়াংশ আসনে নারী প্রার্থী মনোনয়ন দিতে হবে।তবে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ অধিকাংশ দল এই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে।
বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়, নারী আসনসমূহ বিদ্যমান সংরক্ষিত পদ্ধতিতে অর্থাৎ দলগুলোর প্রাপ্ত আসনের অনুপাতে মনোনয়ন নির্ধারণ হবে।অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ১০০ আসনে নারীদের সরাসরি নির্বাচনের প্রস্তাবনা পেশ করে। জামায়াত ইসলাম পিআর পদ্ধতিতে আসন বণ্টনের প্রস্তাব দেয়।
বিএনপির সর্বশেষ স্থায়ী কমিটির বৈঠকে নারী প্রতিনিধিত্ব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে দলটি জানায়, তারা নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং অংশগ্রহণ বাড়াতে আগ্রহী। এই অবস্থান থেকে বর্তমানে সংরক্ষিত ৫০টি নারী আসন ১০০-তে উন্নীত করার প্রস্তাবকে সমর্থন জানায়।
বিএনপি এ বৈঠকে একটি হাইব্রিড মডেল প্রস্তাবের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, ১০০ আসনের মধ্যে ৫০টি থাকবে সংরক্ষিত; আর বাকি ৫০টি নারী আসনে সরাসরি নির্বাচন হবে, তবে তা ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন হবে। দলটি প্রস্তাব করে, আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে অন্তত ৫ শতাংশ (১৫টি) আসনে নারী প্রার্থীদের সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা থাকবে। পরবর্তী, অর্থাৎ চতুর্দশ সংসদে এই সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়াবে ৩০-এ।
বৈঠকে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়েও আলোচনা হয়। দলটি মনে করে, সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীকে পর্যাপ্ত ক্ষমতা দিতে হবে; নতুবা কার্যকর সরকার চালানো সম্ভব নয়। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা মাত্রাতিরিক্ত বাড়ালে গণতান্ত্রিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হতে পারে বলেও মত দেওয়া হয়।
স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, যারা পিআর পদ্ধতির দাবি তুলছেন, তাদের উদ্দেশ্য সুস্থ নির্বাচন নয় বরং নির্বাচন প্রক্রিয়া জটিল করে তোলা। এতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও ঝুঁকির মুখে পড়বে।