কিন্তু চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শহীদদের রক্তের সঙ্গে প্রতারণা করে একশ্রেণির সুযোগসন্ধানীর হাত ধরে শুরু হয়েছে নির্মম ও অনৈতিক ‘মামলা বাণিজ্য’। দেশজুড়ে এমন হাজারো মামলায় নিরীহ মানুষকে ঢালাওভাবে আসামি করা হয়েছে। অপরাধী চক্র সাধারণ মানুষকে হয়রানি করছে এবং এজাহার থেকে নাম বাদ দেওয়ার কথা বলে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। তাদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, শীর্ষ শিল্পপতি, আইনজীবী এমনকি পুলিশ সদস্যরাও। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই মামলা বাণিজ্যের কারণে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্যই প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
এক লাশের ঘটনায় একাধিক মামলা, জালিয়াতির অভিযোগ
ইব্রাহীম হত্যার ঘটনায় যাত্রাবাড়ী থানায় একটি হত্যা মামলা করা হয় (মামলা নম্বর: ৪৭/৭/২৫)। তবে ইব্রাহীমের বাবা হানিফ মিয়া জানান, তিনি মামলা দায়ের করলেও এজাহারে থাকা আসামিদের কাউকেই তিনি চেনেন না এবং কারও বিরুদ্ধে তার ব্যক্তিগত অভিযোগও নেই। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “যাত্রাবাড়ী থানায় যাওয়ার পর পুলিশের এক কর্মকর্তা তড়িঘড়ি করে মামলার কাগজে আমার স্বাক্ষর নেন এবং বলেন, পরে চাইলে নাম বাদ দেওয়া যাবে।”
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ইব্রাহীম নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সোনারগাঁ ও ফতুল্লা থানায় আরও দুটি পৃথক মামলা হয়েছে। সোনারগাঁ থানার মামলায় বাদী হানিফ মিয়া হলেও ফতুল্লা থানায় একই ঘটনায় বাদী হয়েছেন অজ্ঞাত এক ব্যক্তি।
এই জালিয়াতি মামলার শিকার হয়েছেন সোনারগাঁর স্থানীয় সাংবাদিক এনামুল হক বিদ্যুৎ। তিনি সোনারগাঁ মামলার ২২১ নম্বর এবং যাত্রাবাড়ী মামলার ২০৮ নম্বর আসামি। জানা গেছে, ভুক্তভোগীদের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে ইতোমধ্যে প্রায় ২০০ আসামির নাম প্রত্যাহারের জন্য আদালতে হলফনামা জমা দিয়েছেন হানিফ মিয়া। অভিযোগ রয়েছে, এসব নাম প্রত্যাহারের বিনিময়ে বড় অঙ্কের টাকা লেনদেন হয়েছে।
শুধু সাধারণ অপরাধী চক্রই নয়, এর সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একশ্রেণির সদস্যও জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। ইব্রাহীম হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা যাত্রাবাড়ী থানার এসআই আশরাফুজ্জামানের বিরুদ্ধে এক আসামির নাম বাদ দেওয়ার বিনিময়ে ৫০ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করার তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে।
অস্তিত্বহীন মৃতদেহ ও ‘ভাড়াটে’ বাদী
এমন আরেকটি সুপরিকল্পিত জালিয়াতির ঘটনা সামনে আসে মোহাম্মদপুর থানায় দায়ের করা ফাতেমা হত্যা মামলায় (মামলা নম্বর: ৬২/২/২৫)। মামলার বাদী সুমন দাবি করেন, তার স্ত্রী ফাতেমাকে বছিলা ব্রিজের নিচে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এবং পরে লাশ আশুলিয়ার ইয়ারপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়।
তবে অনুসন্ধানে ইয়ারপুর কবরস্থান কমিটির সভাপতি ফারুক জানান, সেখানে ফাতেমা নামের কোনো নারীকে দাফন করা হয়নি এবং বহিরাগত কাউকে সেখানে দাফনের সুযোগও নেই।
এমনকি সরকারি জুলাই গেজেট ও মোহাম্মদপুর এলাকায় জুলাই মাসে নিহত ২৩ জনের তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সেখানে কোনো নারীর নাম নেই; নিহত সবাই পুরুষ। মূলত অর্থের প্রলোভনে পড়ে সুমন নামের ওই ব্যক্তি ‘বাদী’ হতে রাজি হয়েছিলেন। কার বিরুদ্ধে, কী অভিযোগে মামলা হচ্ছে—সে সম্পর্কেও তার স্পষ্ট ধারণা ছিল না। জালিয়াতির বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর থেকে কথিত বাদী সুমন আত্মগোপনে রয়েছেন।
শীর্ষ ব্যবসায়ী ও আইনজীবীদের টার্গেট
ঢাকা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দায়ের হওয়া এক মামলায় (সিআর-৭৮৪/২০২৫) ৩৪৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। এই মামলায় জুলাই আন্দোলনের সম্মুখসারির আইনজীবী ব্যারিস্টার সরোয়ার হোসেনকে ‘ঢাকা দক্ষিণ মহানগর আওয়ামী লীগের নেতা’ হিসেবে দেখিয়ে আসামি করা হয়। মামলার বাদী ছিনোরা বেগম টেলিফোনে স্বীকার করেন, অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে জামায়াতের এক ব্যক্তি তার স্বাক্ষর নিয়ে মামলা করিয়েছেন। যদিও প্রতিশ্রুত কোনো টাকাই তিনি পাননি।
একইভাবে উত্তরা পশ্চিম থানার এক মামলায় (সিআর মামলা নং-৪৫/২৪) ৩৬২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকশ ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে, যাদের বড় অংশই দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী। অথচ ঘটনার দিন ও সময়ে বাদী মকবুল হোসেন ঘটনাস্থলেই উপস্থিত ছিলেন না বলে তথ্যপ্রমাণ মিলেছে।
শহীদদের আবেগকে পুঁজি করে এভাবেই কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে অপরাধী চক্র। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাদীরা আসামিদের ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না বলেও অভিযোগ উঠেছে।
সমন্বয়ক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞের ক্ষোভ
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক আসাদ বিন রনি এই মামলা বাণিজ্যের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, “একটি স্বার্থান্বেষী অপরাধী চক্র আমাদের ভাইদের পবিত্র রক্ত ও মহান ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে নিজেদের উপার্জনের হাতিয়ার বানিয়েছে। সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে এসব জালিয়াতি চক্রের বিচার হওয়া উচিত।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হকও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানকে বাণিজ্যের হাতিয়ার বানিয়ে অপরাধী চক্র সাধারণ মানুষকে হয়রানি করছে। মিথ্যা মামলায় ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব।”
কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস
গণঅভ্যুত্থান ঘিরে মামলা বাণিজ্যে পুলিশ কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস) এএইচএম শাহাদাত হোসেন বলেন, “মামলা বাণিজ্য বা এজাহার নিয়ে অনৈতিক লেনদেনের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে জড়িত পুলিশ কর্মকর্তা বা বহিরাগত চক্রের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। বিভাগীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”