প্রাক-ইসলামি সমাজে রোজার প্রচলন
রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে আরব সমাজে বিভিন্ন ধরনের উপবাসের রীতি ছিল। কেউ আশুরার দিনে রোজা রাখতেন, কেউ চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে যা ‘আইয়ামুল বিজ’ নামে পরিচিত। কুরআনেও উল্লেখ আছে, পূর্ববর্তী জাতিগুলোর ওপরও রোজা নির্ধারিত ছিল, যদিও তার ধরন এক ছিল না।
ইতিহাসে দেখা যায়, আগের নবীদের আমলেও উপবাসের বিধান ছিল। নবী আদম (আ.)-এর যুগে মাসে তিন দিন রোজার কথা বর্ণিত হয়েছে। দাউদ (আ.) একদিন পরপর রোজা রাখতেন। মুসা (আ.) তুর পাহাড়ে ৩০ দিনের সঙ্গে আরও ১০ দিন মিলিয়ে মোট ৪০ দিন সিয়াম পালন করেছিলেন। আর মুহাম্মদ (সা.) মক্কা জীবনে প্রতি মাসে তিন দিন করে রোজা রাখতেন।
আশুরা থেকে রমজান
মদিনায় হিজরতের পর নবী (সা.) লক্ষ্য করেন, ইহুদিরা আশুরার দিনে রোজা রাখছে। তারা জানান, এ দিনে আল্লাহ মুসা (আ.)-কে ফেরাউনের হাত থেকে মুক্তি দেন। তখন নবী (সা.) নিজেও আশুরার রোজা রাখেন এবং সাহাবিদের রাখতে বলেন। সে সময় পর্যন্ত রমজানের পূর্ণ একমাস রোজা ফরজ হয়নি; আইয়ামুল বিজসহ কিছু নফল রোজাই প্রচলিত ছিল।
হিজরি দ্বিতীয় বর্ষে ফরজ ঘোষণা
হিজরি দ্বিতীয় বছরে রমজান মাসে কুরআনের আয়াত নাজিলের মাধ্যমে রোজা ফরজ করা হয়। মক্কা পর্বে আকিদা ও তাওহিদের শিক্ষা জোরালো ছিল, আর মদিনা পর্বে সামাজিক ও শরিয়াহভিত্তিক বিধান প্রণয়ন শুরু হয়। রোজার বাধ্যতামূলক বিধান সেই মদিনাকালীন ব্যবস্থার অংশ।
বিধানে ধাপে ধাপে পরিবর্তন
প্রথমদিকে রোজা পালনে কিছু ছাড় ছিল। কেউ কষ্ট অনুভব করলে ফিদইয়া দিয়ে অব্যাহতি নিতে পারতেন। পরে তা রহিত করে সক্ষম প্রত্যেক মুসলমানের জন্য রোজা আবশ্যক করা হয়।
শুরুর নিয়ম ছিল সন্ধ্যার পর থেকে এশা পর্যন্ত খাবার গ্রহণ করা যাবে; এরপর পরদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত আর কিছু খাওয়া যাবে না। এতে অনেকে অসুবিধায় পড়েন। পরে আয়াত নাজিল হয়ে সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজার সময় নির্ধারিত হয়— যা আজও বহাল রয়েছে।
সেহরি ও ইফতারের সরলতা
সে সময়ের সেহরি ও ইফতার ছিল অত্যন্ত সহজ— খেজুর, পানি, দুধ কিংবা সামান্য মাংস। সীমিত উপকরণেই রোজার চর্চা শুরু হয়েছিল।
ইসলামের স্তম্ভ হিসেবে রোজা
হিজরি দ্বিতীয় বর্ষ থেকে রমজানের রোজা ইসলামের বাধ্যতামূলক ইবাদত হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। আজ প্রায় দেড় হাজার বছর ধরে বিশ্বের মুসলমানরা একই বিধান মেনে রমজানের সিয়াম পালন করে আসছেন। ধাপে ধাপে প্রণীত ও পরিমার্জিত এই বিধানই রোজাকে ইসলামের অন্যতম মৌলিক স্তম্ভে পরিণত করেছে।