পারভীনের স্বামী ওই অগ্নিকাণ্ডে নিখোঁজ। তিনি জানান, স্বামী এনজিও থেকে প্রায় এক লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। মৃত্যুসনদ না থাকায় ঋণ মওকুফ হয়নি, আবার বিধবা ভাতার জন্য আবেদনও করতে পারছেন না। ধর্মীয় রীতিতে আচার-অনুষ্ঠানও পালন করা যায়নি। পারভীনের মা খাদিজা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “মইরা গেলে আড্ডিটা তো থাকে, দাফন করতাম, মনরে সান্ত্বনা দিতাম।”
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে বহু কারখানার মতো গাজী টায়ার্সেও লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ ঘটে। কারখানার মালিক ছিলেন তৎকালীন বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী ও চারবারের সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম দস্তগীর গাজী। ২৫ আগস্ট ভোরে রাজধানী থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হলে আবারও লুটপাট শুরু হয় এবং কারখানার ভেতরের একটি ছয়তলা ভবনে আগুন ধরানো হয়।
ঘটনার পর নারায়ণগঞ্জের তৎকালীন জেলা প্রশাসক একটি আট সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন। তারা ১২ সেপ্টেম্বর ৩২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে ১৮২ জন নিখোঁজের তালিকা উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভবনটি অপসারণের মাধ্যমে উদ্ধারকাজ চালানোর সুপারিশ করা হলেও আজও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
তদন্তে উঠে আসে, ৫ আগস্ট থেকে টানা কয়েকদিন লুটপাট চলে। ২৫ আগস্ট গোলাম দস্তগীরের গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়লে আবারও সংঘর্ষ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ হয়। রাত সাড়ে ১০টার দিকে দুর্বৃত্তরা ভবনের নিচতলায় আগুন ধরিয়ে গেটের শাটার বন্ধ করে দেয়। এতে ভেতরে থাকা অনেকে বের হতে পারেননি। ভবনের ভেতরে দাহ্য পদার্থ থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং নিভতে পাঁচ দিন সময় লাগে। ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় উদ্ধার অভিযান চালানো সম্ভব হয়নি।
তদন্ত কমিটি স্বজনদের কাছে যথাযথ প্রক্রিয়ায় হাড়গোড় হস্তান্তরের সুপারিশ করলেও বাস্তবে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে বর্তমান জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, “তদন্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে কিছু জানি না। নিখোঁজদের পরিবার বারবার এসেছেন, আমরা জেলা পুলিশকে দায়িত্ব দিয়েছি। তবে কোনো অগ্রগতি জানানো হয়নি।”
জেলা পুলিশের জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার মেহেদী ইসলাম জানান, প্রশাসনের তালিকা ধরে পুলিশ অনুসন্ধান চালাচ্ছে। নিখোঁজদের মোবাইল নম্বরের সর্বশেষ লোকেশন ও সংযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কয়েকজন পুলিশ সদস্য পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগও করেছেন। কিন্তু এখনও কাউকে শনাক্ত করা যায়নি।
সম্প্রতি কারখানাটিতে প্রবেশের অনুমতি না পাওয়া গেলেও বাইরে থেকে ভবনটিকে আগের মতোই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে—অগ্নিকাণ্ডের ছাপ এখনো স্পষ্ট। গাজী গ্রুপের এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “প্রথম সাত দিন ধরে টানা লুটপাট হলেও কোনো প্রশাসনিক সহায়তা মেলেনি। মালিক কারাগারে থাকায় কারখানাও চালু করা সম্ভব হয়নি।”
এভাবেই দীর্ঘ এক বছর পরও অগ্নিকাণ্ডে নিখোঁজদের পরিবারগুলো অপেক্ষায় আছেন—এক টুকরো হাড়গোড় হাতে পাওয়ার জন্য, যাতে অন্তত দাফন করে প্রিয়জনের জন্য মনকে সান্ত্বনা দেওয়া যায়।