২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসের পরিসংখ্যানভিত্তিক একটি বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে দেশটির সংগীত চার্টিং সংস্থা সার্কেল চার্ট। প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, শীর্ষ ৪০০ গানের ডিজিটাল স্ট্রিমিং গত বছরের তুলনায় কমেছে ৬ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০১৯ সালের তুলনায় এই পতনের হার প্রায় ৫০ শতাংশের কাছাকাছি। অ্যালবাম বিক্রিও এই ধারা থেকে বাদ পড়েনি। গত বছর যেখানে ৪৬ দশমিক ৭ মিলিয়ন অ্যালবাম বিক্রি হয়েছিল, চলতি বছর তা নেমে এসেছে ৪২ দশমিক ৪ মিলিয়নে। এমনকি ১ মিলিয়ন বিক্রির মাইলফলক ছোঁয়া অ্যালবামের সংখ্যাও কমেছে। গত বছর যেখানে ৯টি অ্যালবাম এই সংখ্যা অতিক্রম করেছিল, এবার তা নেমে এসেছে ৭-এ। বিগত বছর সেভেনটিনের অ্যালবাম ৩ মিলিয়ন বিক্রির রেকর্ড গড়লেও এবছর কোনো অ্যালবামই সেই উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেনি।
বিশ্বমঞ্চে কে-পপের দাপট বাড়ার পরও স্বদেশে জনপ্রিয়তা কমার পেছনে একাধিক কারণ দেখছেন বিশ্লেষকরা। সার্কেল চার্টের ডেটা বিশ্লেষক কিম জিন-উ মনে করেন, বিশ্ববাজার ধরার প্রতিযোগিতায় কে-পপ শিল্পীরা ইংরেজি গানের দিকে ঝুঁকছেন। এর ফলে স্থানীয় শ্রোতারা তাঁদের সংস্কৃতির স্বাদ, ভাষার মাধুর্য এবং নিজস্বতা খুঁজে পাচ্ছেন না। একইসঙ্গে সাউন্ড ডিজাইনে একঘেয়েমিও ভর করেছে বলে তাঁর দাবি। ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার শ্রোতারা ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন এই ধারার গান থেকে।
আরেকটি বড় পরিবর্তন এসেছে শিল্পী কাঠামোতেও। ব্যান্ড সংস্কৃতি দিয়ে শুরু হলেও বর্তমানে কে-পপে একক শিল্পীদের উত্থান চোখে পড়ার মতো। এবছর বিভিন্ন চার্টে শীর্ষ ১০-এর মধ্যে ৭ জনই একক শিল্পী, যা আগে ব্যান্ডগুলোর জন্য বরাদ্দ ছিল। সংগীত সমালোচক লিম হি-ইয়ুন মনে করেন, ‘আইডল গ্রুপগুলোর গানগুলো প্রযুক্তিগত দিক থেকে নিখুঁত হলেও, এগুলো অনেক সময় শ্রোতাদের আবেগ স্পর্শ করতে পারছে না। অন্যদিকে একক শিল্পীরা ব্যক্তিগত অনুভব ও সৃজনশীলতা দিয়ে শ্রোতাদের মন জয় করছেন।’
কে-পপ ইন্ডাস্ট্রিতে নবাগত বা ‘রুকি’ গার্ল গ্রুপগুলো বরাবরই নতুন ভক্ত তৈরির বড় মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তবে ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে তেমন কোনো রুকি গ্রুপের উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখা যায়নি। শীর্ষ ১০-এ জায়গা পাওয়া তিনটি গার্ল গ্রুপ—এসপা, আইভ এবং নিউজিনস—এর কেউই নবাগত নয়। ফলে নতুন বাজার তৈরি এবং শ্রোতা আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রেও কিছুটা স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
এক বিনোদন সংস্থার কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ‘বিশ্বের মূলধারায় প্রবেশের চেষ্টায় অনেক গ্রুপ এমন গান করছে, যা কোরিয়ান শ্রোতাদের কাছে আর আগ্রহ জাগাচ্ছে না।’ তাঁর মতে, বিশ্ববাজারের প্রবাহে ভেসে গিয়ে যদি কে-পপ নিজস্বতা হারায়, তাহলে সেটা গোটা ইন্ডাস্ট্রির জন্যই দীর্ঘমেয়াদে হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
শিল্প–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, স্থানীয় শ্রোতাদের ভালোবাসা ছাড়া কোনো শিল্পই টেকসই হতে পারে না। কে-পপ যদি ঘরোয়া বাজারেই জনপ্রিয়তা হারাতে থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক উত্থানও ক্ষণস্থায়ী হয়ে পড়তে পারে। তাই শিল্পীরা কোন পথে হাঁটবেন—বিশ্বায়নের ঢেউয়ে নিজস্বতা হারিয়ে ফেলা, নাকি শিকড়ে ফিরে এসে নতুনভাবে নিজেকে আবিষ্কার করা—এখন সেটাই বড় প্রশ্ন।