বরিশালের খাল-বিল যখন বর্ষার জলে থইথই করে, তখন সেই জলপথে ভেসে আসে শত শত পেয়ারা বোঝাই নৌকা। মনে হয়, নদীর বুকেই বসেছে এক প্রাণবন্ত মেলা—এ যেন শুধু একটি বাজার নয়, এক জীবন্ত সংস্কৃতি। বাংলার নদীমাতৃক জীবনের শিকড়ে পৌঁছে দেওয়া এই বাজারটি আজ শুধুই পেয়ারা কেনাবেচার কেন্দ্র নয়, বরং এক মৌসুমি উৎসব, এক জলজ জীবনের প্রতিচ্ছবি।
কোথায় অবস্থিত?
ভাসমান পেয়ারা (ফ্লোটিং গুআবা) বাজার মূলত বরিশাল বিভাগের দক্ষিণে, ঝালকাঠি ও পিরোজপুর জেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত। প্রধানত ভিমরুলি, আটঘর এবং কুড়িয়ানা নামের বাজারগুলো সবচেয়ে পরিচিত এবং পর্যটকদের আকর্ষণ করে। এ বাজারগুলো পিরোজপুর জেলার স্বরূপকাঠি (নেসারাবাদ উপজেলা)-এর কীর্তিপাশা খালে বসে, যা নৌকার মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
বাজার নয় যেন বর্ষার উৎসব
প্রতি বছর জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাসে, যখন ভিমরুলি, আটঘর ও কুড়িয়ানা অঞ্চলের বাগানগুলো ফলনে ভরে ওঠে, তখন এই বাজারও গার্হস্থ্য ও পর্যটকদের জন্য হয়ে ওঠে এক উৎসবমুখর কেন্দ্র। সকাল থেকেই হাজারো নৌকা খালের জলে ভেসে চলে, পেয়ারাভর্তি নৌকার সারি যেন নদীর বুকেই বসেছে এক চলমান মেলা।
পর্যটকদের জন্য স্বপ্নের অভিজ্ঞতা
বরিশালের ভাসমান পেয়ারা বাজার কেবল একটি বাজার নয়—উচ্চারণযোগ্য একটি জীবন্ত সংস্কৃতি ও মানব–প্রকৃতির মেলবন্ধন। এখানে এসে আপনি অনুভব করবেন কিভাবে নদী, মানুষ ও ঐতিহ্য একসাথে বেঁচে আছে । দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য এটি নিছক পর্যটন নয়, বরং হৃদয় স্পর্শ করা এক অভিজ্ঞতা—বিশেষ করে ভিমরুলি, আটঘর ও কুড়িয়ানা অঞ্চলের উৎসবমুখর দৃশ্যপট যেমন মনে ছাপ ফেলে।
কীভাবে যাবেন?
ঢাকা থেকে বরিশাল পৌঁছাতে লঞ্চ বা বাসে ৭–১০ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। বরিশাল থেকে ঝালকাঠি বা পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি এলাকায় যেতে ৩০–৪৫ মিনিট বাস বা কার ভ্রমণ করতে হয়। এরপর খালপাড়ে গিয়ে নৌকা ভাড়া করে ভিমরুলি, আটঘর বা কুড়িয়ানা বাজারে পৌঁছাতে হয়। সম্পূর্ণ দিনের জন্য নৌকা ভাড়া ১৫০০–২০০০ টাকা হলেও, গ্রুপে গেলে জনপ্রতি খরচ মাত্র ৩০০–৫০০ টাকার মধ্যে নামে।
কোথায় থাকবেন?
ভাসমান পেয়ারা বাজার ঘুরে দেখতে চাইলে রাতে থাকতে পারেন ঝালকাঠি শহরের হোটেলগুলোতে, যেমন Hotel Grand Park বা Hotel Rodela—যেখান থেকে বাজারে যাওয়া সহজ। যারা একটু ভিন্ন অভিজ্ঞতা চান, তারা স্বরূপকাঠি বা ভিমরুলি এলাকার নদীঘেঁষা গেস্টহাউস বা ভিলায় অবস্থান করতে পারেন। এসব জায়গা থেকে সকালবেলায় নৌকা নিয়ে সরাসরি বাজারে পৌঁছানো যায় দ্রুত ও আরামদায়কভাবে।
বাজেট পরিকল্পনা (১ দিনের জন্য)
ঢাকা থেকে বরিশাল যেতে মূল্য: ২০০–৮০০ টাকা। বরিশাল থেকে ঝালকাঠি/পিরোজপুর: ৫০–১০০ টাকা। নৌকা ভাড়া: ১৫০০–২০০০ টাকা (পুরো দিন)। খাবার ও অন্যান্য: ২০০–৩০০ টাকা। মোট (গ্রুপে গেলে): প্রায় ৮০০–১০০০ টাকা জনপ্রতি।
সতর্কতা
যারা সাঁতার জানেন না, তাদের জন্য লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। বর্ষার দিনে খালে পানির প্রবাহ বেশি—অতএব সতর্ক হওয়া আবশ্যিক। ছাতা ও রেইনকোট সঙ্গে রাখলে অপ্রত্যাশিত বৃষ্টিতে সুরাহা সম্ভব। ক্যামেরা ও ডিভাইস ওয়াটারপ্রুফ ব্যাগে রাখলে নিরাপত্তা হয়। নদীতে প্লাস্টিক ও আবর্জনা না ফেলা এবং ভ্রমণকালে স্থানীয়দের সম্মান দেখানো, ছবি তুলতে অনুমতি নেওয়া—সব মিলিয়ে এটি এক প্রকৃত, দায়িত্বশীল ভ্রমণ।