আদালতে প্রতারণা
উচ্চ আদালতে তথ্য গোপন করে জালিয়াতির মাধ্যমে মামলা বাতিল করেছেন রূপগঞ্জের শীর্ষ সন্ত্রাসী, জুয়াড়ি ও প্রতারক তারিকুল ইসলাম মোঘল। কয়েক বছর ধরে স্থানীয়দের সঙ্গে নানা প্রতারণা চালানোর পর এবার তিনি আদালতের সঙ্গেও একই কাজ করলেন।
তথ্য বিশ্লেষণে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি একটি নামকরা আবাসন প্রতিষ্ঠানের ৪৮ কোটি ৪১ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। ওই মামলায় ৩ এপ্রিল আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। এরপর ২০২৫ সালের ৩ আগস্ট তিনি জামিন পান। কিন্তু বাদীপক্ষ ৭ আগস্ট জামিন বাতিলের আবেদন করলে আদালত তাকে অনুপস্থিত দেখে জামিন বাতিল করেন। পরে চতুর মোঘল আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতে মিথ্যা তথ্য দেন, যার ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর মামলা বাতিল হয়ে যায়।
আশ্চর্যজনকভাবে তার আইনজীবী খন্দকার আহসান হাবীবও স্বীকার করেছেন, তিনি আগের জামিন বাতিলের তথ্য জানতেন না। প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম বলেন, তথ্য গোপন করা “ফৌজদারি অপরাধ ও অসদাচরণ”; সরকারি আইন কর্মকর্তার আবেদন হলে এই রায় বাতিল হতে পারে। ব্যারিস্টার লিপি আক্তারও মত দেন, আসামির তথ্য গোপনের কারণে রায় পুনর্বিবেচনা সম্ভব।
কে এই মোঘল?
রূপগঞ্জের স্থানীয়দের কাছে মোঘল পরিচিত একজন ভয়ংকর সন্ত্রাসী ও প্রতারক হিসেবে। একসময় ভূমিদস্যু ও জুয়াড়ি হিসেবে পরিচিত হলেও বর্তমানে তার রয়েছে বিদেশে নানা ভিসা— দুবাইয়ের ১০ বছরের গোল্ডেন ভিসা, থাইল্যান্ডের ২০ বছরের এলিট ভিসা, নেপাল ও শ্রীলঙ্কাতেও রয়েছে যাতায়াত। ফলে পরিস্থিতি বেগতিক হলেই তিনি বিদেশে পালিয়ে যান।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এখনও তিনি জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করেন, জমি দখল করে বিক্রি করেন এবং অবৈধ আয়ে বিদেশে প্রমোদ ভ্রমণ ও ক্যাসিনো জুয়ায় অর্থ উড়ান। দুবাইতে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সঙ্গেও তার যোগাযোগ রয়েছে।
অপরাধের দীর্ঘ তালিকা
মোঘলের নামে রয়েছে অসংখ্য মামলা। নারায়ণগঞ্জ আদালতে প্রতারণা ও জালিয়াতির দুটি সিআর মামলা, রূপগঞ্জ থানায় ২০২৩ সালে হত্যাচেষ্টা মামলা (নং-৩১৬), বাছির হত্যা মামলা, সাবেক মেয়রদের হত্যাচেষ্টা ও মারধরের অভিযোগ এবং ২০০৯ সালে হত্যাচেষ্টা মামলা (নং-৩৯) নথিভুক্ত রয়েছে। এসব মামলার বেশিরভাগই এখনও তদন্তাধীন।
সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড
রাজধানীর পূর্বাচল এলাকায় সন্ধ্যার পর সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাচ্ছে মোঘলের বাহিনী। ঘুরতে আসা মানুষদের কাছ থেকে মোবাইল, মানিব্যাগ লুটে নেওয়া, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করা, চাহিদামতো চাঁদা না পেলে নির্যাতন চালানো— সবই তার বাহিনীর কাজ।
রাজনৈতিক আঁতাত
স্থানীয়দের অভিযোগ, যুবলীগের পরিচয়ে বেড়ে ওঠা মোঘল এখন ভোল পাল্টে অন্য রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় কাজ করছেন। বিদেশ থেকে আওয়ামী লীগের কিছু নেতার নির্দেশনায় তিনি রূপগঞ্জে সংগঠন পুনর্গঠনের তৎপরতা চালাচ্ছেন। এতে স্থানীয় একটি পক্ষ তাকে মদদ দিচ্ছে বলেও জানা গেছে।
জনমনে ক্ষোভ
এমনকি আদালতের সঙ্গে প্রতারণা করে মামলা বাতিল করেও তিনি এখনও প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন—এ নিয়ে জনমনে ব্যাপক ক্ষোভ ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। স্থানীয়রা মনে করেন, দুদক, সিআইডি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে শতভাগ সত্য বেরিয়ে আসবে। কিন্তু অদৃশ্য কারণে তারা এখনও উদ্যোগ নিচ্ছে না।