জহুরুল আলম জসিম চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) ৯ নম্বর উত্তর পাহাড়তলী ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর। প্রায় দেড় বছর কারাবন্দি থাকার পর সম্প্রতি তিনি সব মামলায় জামিন পান। নতুন কোনো মামলায় তাকে শ্যোন অ্যারেস্ট না দেখিয়ে কারাগার থেকে মুক্তি নিশ্চিত করার জন্য দুই দফায় এই টাকা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পুরো বিষয়টিতে মধ্যস্থতা করেন চট্টগ্রাম মহানগর যুব মহিলা লীগের সদস্য ও চসিকের ৭ নম্বর পশ্চিম বাকলিয়া ওয়ার্ড যুব মহিলা লীগের সভাপতি সোনিয়া আজাদ।
গত বছরের ৫ মার্চ ঢাকার বসুন্ধরা এলাকা থেকে জসিমকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর তার বিরুদ্ধে ২৭টি মামলা করা হয়। সব মামলায় জামিন পাওয়ার পর গত ৮ জুলাই তার কারামুক্তির কথা ছিল। ওই সময় নতুন করে কোনো মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট না দেখানোর বিষয়ে ডিসি আমিরুলের সঙ্গে জসিমের পরিবারের সমঝোতা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রথম দফায় ১২ লাখ টাকা দেওয়া হয়। এ সময় জসিমের স্ত্রী তাসলিমা বেগম, ভাই আকবর হোসেন খোকন ও মধ্যস্থতাকারী সোনিয়া আজাদ উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিষয়টি সামলাতে না পারায় জসিমকে কোতোয়ালি থানার একটি পুরোনো মামলায় আবার গ্রেফতার দেখানো হয়।
পরে জসিমকে পুরোপুরি মুক্ত করার আশ্বাস দিয়ে দ্বিতীয় দফায় আরও ১৫ লাখ টাকা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সব মিলিয়ে দুই দফায় ২৭ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
জানা গেছে, সোনিয়া আজাদের স্বামী আবু নাসের চৌধুরী আজাদও ৫ আগস্টের পর গ্রেফতার হয়ে কারাগারে যান। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় কমিউনিটি পুলিশিংয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে পুলিশের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সঙ্গে তার পরিচয় ছিল বলে জানা যায়। সেই যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি নিজে কারামুক্ত হওয়ার পাশাপাশি ডিসি আমিরুলের সঙ্গে যোগাযোগ করে স্বামীকেও মুক্ত করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
কারাগারে জসিমের সঙ্গে একই কক্ষে ছিলেন সোনিয়ার স্বামী। সেই সূত্র ধরেই জসিমের পরিবারের সঙ্গে সোনিয়ার যোগাযোগ হয় বলে জানা গেছে।
জসিমের ভাই আকবর হোসেন খোকন বলেন, প্রথমদিকে তার ভাবি তাকে বিষয়টি জানাননি। পরে তিনি জানতে পারেন, সোনিয়া আজাদ নামে এক নারী জসিমকে কারাগার থেকে বের করার বিষয়ে কাজ করছেন। কিন্তু মুক্তির দিন সীতাকুণ্ড ও কোতোয়ালি থানার দুটি মামলায় জসিমকে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়। তার ভাষ্য, কারাগারে জসিমের সঙ্গে একই কক্ষে ছিলেন আজাদ, যিনি সোনিয়ার স্বামী। বিষয়টি নিয়ে তিনি বলেন, এসবের বিচার আল্লাহ করবেন।
অন্যদিকে, কারামুক্তির বিষয়ে সোনিয়া আজাদ বলেন, এখন সবাই জানে কে কীভাবে কারাগার থেকে বের হচ্ছে। নিজের স্বামীর বিষয়টি তিনি সামলেছেন এবং কীভাবে কাজ করতে হয়, তা তিনি জানেন। স্বামীকে মুক্ত করতে কোথায় কত টাকা দিয়েছেন, তা প্রকাশ করতে চাননি। তার দাবি, বিষয়টি এখন একটি নিয়মে পরিণত হয়েছে এবং সবাই সেই নিয়মের মধ্যেই পড়ে গেছে।
তবে ডিসি আমিরুল ইসলামকে টাকা দেওয়ার অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেন সোনিয়া। তিনি বলেন, তার স্বামী আজাদ দুবার কারাগারের গেট থেকে ফিরে গিয়েছিলেন এবং তৃতীয়বার তাকে বের করা সম্ভব হয়। সে সময় ডিসি আমিরুল টাকা নিয়েছেন এমন কথা উঠলেও সেটি সত্য নয় বলে দাবি করেন তিনি। প্রশাসনকে জড়িয়ে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চান না বলেও জানান।
অন্যদিকে জসিমের বিষয়ে সোনিয়া বলেন, তার স্বামী আজাদ ও জসিমের অবস্থান এক নয়। জসিমের ভাই খোকনের আচরণ নিয়ে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। জসিমের বিষয়টি সামলাতে গিয়ে তার পেছনে এখনো অনেক মানুষ সক্রিয় রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এ নিয়ে দুশ্চিন্তার মধ্যে তার স্বামী অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন বলেও জানান সোনিয়া।
এদিকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন সিএমপির ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড ফোর্স শাখার ডিসি মো. আমিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, সাবেক কাউন্সিলর জসিমকে তিনি নিজেই ঢাকার বসুন্ধরা এলাকা থেকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠিয়েছিলেন। তাকে কারাগার থেকে মুক্ত করার বিষয়ে সহযোগিতা বা তদবির করার কোনো প্রশ্নই আসে না। এ বিষয়ে তার সঙ্গে কারও কথাও হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
প্রসঙ্গত, গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে সিএমপির উত্তর বিভাগের ডিসি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর সাংবাদিক, এক নারী শিক্ষার্থী এবং ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে মারধর ও লাঞ্ছিত করার অভিযোগ উঠেছিল আমিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে। পরে গত ১৮ জুন তাকে উত্তর বিভাগ থেকে সরিয়ে সিএমপির ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড ফোর্স শাখায় বদলি করা হয়।
সূত্র: যুগান্তর