২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রক্তক্ষয়ী জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের লক্ষ্যে প্রথমে ৬টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়, যা পরে সমন্বিত হয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে রূপ নেয়। কমিশনের দায়িত্ব ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ভবিষ্যতের শাসন কাঠামোর নকশা তৈরি করা।
কমিশন সূত্রে জানা গেছে, দুই দফা সংলাপ শেষে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যে ৮২ দফা প্রস্তাব ও ৯ দফা অঙ্গীকারনামা চূড়ান্ত করা হয়েছে। খসড়ায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পটভূমি, সংস্কার কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া এবং দুই ধাপের আলোচনায় গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো অন্তর্ভুক্ত আছে। কোন প্রস্তাবে কোন দলের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রয়েছে, তাও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রাথমিক খসড়ায় উল্লেখ ছিল—পরবর্তী দুই বছরের মধ্যে সনদের সুপারিশ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করবে দলগুলো। বিএনপি ও কয়েকটি সমমনা দল এ প্রস্তাব সমর্থন করলেও জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলনসহ অধিকাংশ দল আপত্তি জানায়। তাদের দাবি—সনদ বর্তমান সরকারের মেয়াদকালেই বাস্তবায়ন ও আইনি ভিত্তি দিতে হবে, অন্যথায় তারা স্বাক্ষর করবে না। এই পরিস্থিতিতে কমিশন আলোচনা মাধ্যমে দ্রুত বাস্তবায়নের রূপরেখা তৈরির উদ্যোগ নেয়।
এরইপ্রেক্ষিতে গত ১০ এবং ১২ আগস্ট সংবিধান ও আইনজ্ঞদের সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন আলোচনা করে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ৯ দফা অঙ্গীকারনামা সহ জুলাই সনদের পুর্নাঙ্গ খসড়া প্রস্তুত করে বলে কমিশন সূত্রে জানা গেছে।
ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার জানিয়েছেন, আজ কমিশনের পক্ষ থেকে জাতীয় (জুলাই) সনদের পূর্ণাঙ্গ খসড়া রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পাঠানো হবে।
কমিশন সূত্রে জানা গেছে, সমন্বিত খসড়ায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পটভূমি, সংস্কার কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া এবং দুই ধাপের সংলাপে গৃহীত ৮২টি প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কোন প্রস্তাবে কোন দলের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রয়েছে, তাও সেখানে উল্লেখ থাকবে। পাশাপাশি থাকবে সনদ বাস্তবায়নের জন্য প্রণীত ৯ দফা অঙ্গীকারনামা, যার ভিত্তিতে রাজনৈতিক দল ও জোটগুলো সনদে স্বাক্ষর করবে।
অঙ্গীকারনামায় বলা হয়েছে সনদের ব্যাখ্যা, প্রয়োগ ও বৈধতা সংক্রান্ত এখতিয়ার আপিল বিভাগের ওপর ন্যস্ত থাকবে এবং সনদকে আইনগতভাবে সম্পূর্ণ কার্যকর হিসেবে গণ্য করা হবে। এর বৈধতা, প্রয়োজনীয়তা কিংবা জারি করার ক্ষমতা আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না বলেও উল্লেখ রয়েছে। একইসঙ্গে সনদের কোনো শব্দ, বাক্য বা নীতিমালা সংবিধান বা অন্য কোনো আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে সনদকেই প্রাধান্য দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে
খসড়ায় বলা হয়েছে, অবিলম্বে বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশগুলো আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বেই সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথাযথ ও কার্যকর পদক্ষেপে বাস্তবায়ন করবে। অঙ্গীকারনামায় আরও উল্লেখ আছে—গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রাম এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে হাজারো প্রাণহানি ও বিপুল ক্ষয়ক্ষতির মধ্য দিয়ে প্রাপ্ত জনআকাঙ্ক্ষার জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
জনগণের সর্বজনীন অভিপ্রায়ে প্রণীত এই সনদের সব বিধান, নীতি ও সিদ্ধান্ত সংবিধানের ৯৩(২) অনুচ্ছেদ বা অন্য কোনো আইন বা রায়ের তোয়াক্কা না করেই কার্যকর ও প্রাধান্য পাবে—এটি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় অধ্যাদেশ জারি করার অঙ্গীকারও এতে অন্তর্ভুক্ত।
খসড়ায় দেশের শাসন ব্যবস্থা—সংবিধান, বিচার ব্যবস্থা, নির্বাচন ব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, পুলিশি ব্যবস্থা ও দুর্নীতি দমন ব্যবস্থার সংস্কারের জন্য সাংবিধানিক সংশোধন, সংযোজন, পরিমার্জন, লিখন ও পুনর্লিখন; বিদ্যমান আইনের সংশোধন বা নতুন আইন প্রণয়ন; প্রয়োজনীয় বিধি ও প্রবিধি সংশোধন বা পরিবর্তনের সুপারিশও রাখা হয়েছে।
এছাড়া, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় অব্যাহত সংগ্রাম, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানকে সংবিধানে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার, শহীদদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা এবং আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের নিশ্চয়তার প্রতিশ্রুতিও থাকবে।
কমিশনের এক সদস্য জানান, জুলাই সনদের আইনি বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করতে গত ১০ আগস্ট ৬ জন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে বৈঠক করা হয়েছে। তাদের লিখিত সুপারিশ আগামী বৃহস্পতিবারের মধ্যে পাওয়ার আশা করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, ওই সুপারিশ ও সনদের খসড়া নিয়ে সেদিনই প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে আলোচনার পরিকল্পনা রয়েছে।
জুলাই সনদের বাস্তবায়ন ও আইনি ভিত্তি সংক্রান্ত তৃতীয় ধাপের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক কবে থেকে শুরু হবে—এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে বদিউল আলম মজুমদার জানান, এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।